অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সঠিক দৃষ্টি আর পরিশ্রম থাকলে বর্জ্যকেও সম্পদে রূপান্তর করা যায়, নর্দমা
থেকে বিদেশে-মাছের আঁশের এ যাত্রা উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামে এক নতুন
অর্থনৈতিক অনুষঙ্গ রচনা করেছে|কুড়িগ্রামের এ আকর্ষণীয় বিপ্লব সকলের দৃষ্টি
ঘুরিয়ে দিয়েছে|কুড়িগ্রামের বিভিন্ন বাজারে এখন আর মাছের আঁশ কিংবা নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেয়া হয়
না|রুই, কাতলা, মৃগেল কিংবা ইলিশের ঝকঝকে আঁশগুলো পরম মমতায় সংগ্রহ করেন
শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা|
সংগৃহিত এ আঁশগুলো প্রথমে সাধারণ পানিতে এবং
পরে গরম পানিতে ধুঁয়ে ধবধবে পরিস্কার করা হয়|এরপর রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে
রূপালি চাকতিতে পরিণত করে তা তুলে দেয়া হয় পাইকারের হাতে| প্রতিমন শুকনো
আঁশ এখন বাজারে দুই থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা প্রান্তিক
মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে অভাবনীয় সচ্ছলতা|শহরের বিভিন্ন বাজারে ঘুরে জানা যায়, ‘শুধু আঁশ নয়, মাছের নাড়িভুঁড়ি, পাখনা
এমনকি পেটের বেলুনও এখন বিক্রি হয়| আগে যা দুর্গন্ধ ছড়াত, এখন তা আমাদের
পকেটে টাকা দিচ্ছে|
’ মাছ কাটা শ্রমিকদের কন্ঠেও আনন্দের সুর, দিনে কয়েকমন
মাছ কেটে এখন আর আঁশ ফেলে দেন না, দিন শেষে এ উচ্ছিষ্ট বিক্রি করেই মেলে
বাড়তি পারিশ্রমিক|মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মাছের আঁশ এখন বিশ^জুড়ে এক পরিবেশবান্ধব
কাঁচামাল|রাসায়নিক এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ খাতটি দ্রুত ক্ষুদ্র থেকে
মাঝারি শিল্পে পরিণত হচ্ছে| বরিশালে চিংড়ির শেল থেকে গ্লোবাল ক্যাপসুল ˆতরি
করা হচ্ছে এর কাঁচামাল হিসাবে মাছের আঁশ নেয়া যায় কিনা চিন্তা করতে পারে|আঁশের গুণগতমান বজায় রাখতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পরামর্শে ও সহযোগীতায়
বিজ্ঞানীরা এগিয়ে আসা উচিত|
কেন এ আঁশের এত কদর? বিজ্ঞানীর বলছেন মাছের আঁশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ‘কোলাজেন’ যা দিয়ে তৈরি হয় জীবনরক্ষাকারী ঔষধের ক্যাপসুলের কভার, উন্নতমানের কসমেটিকস, ফুড সাপ্লিমেন্ট এমনকি কৃত্রিম কর্ণিয়া|শুধু তাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাটারি তৈরি, রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং পোলট্রি খাদ্য হিসাবেও এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে|এ বহুমুখী ব্যবহারের কারণেই ফেলে দেয়া আঁশ এখন কুড়িগ্রামের ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান আর আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে|
কুড়িগ্রামের নদনদী আর জলাশয়ের রূপালি মৎস্যের সেই উচ্ছিষ্ট অংশ এখন ‘কোলাজেন’ হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে জাপান, চীন ও ইউরোপের অভিজাত বাজারে|এক সময় যা ছিল পঁচা বর্জ্য, অবহেলায় পড়ে থাকত বাজারের নর্দমায়, সেই মাছের আঁশই এখন কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে|কুড়িগ্রামের আশীর্বাদে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক এ মাছের আঁশের ব্যবসা এটাই আমাদের কামনা|লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ|