কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় এসব অপরাধী চক্র সক্রিয়। দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম লেখা হচ্ছে। দল গঠন করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মহড়া হচ্ছে মোটরসাইকেলে। অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনা কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক।গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রায় ৯ মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে।
২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডেও তাদের নাম পাওয়া গেছে। এই পরিসংখ্যানকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিশোরদের একটি অংশ অপরাধী চক্রে যুক্ত হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ আবার একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরা করছে। বড় দলের ভেতরেও তৈরি হচ্ছে নতুন উপদল।সম্প্রতি স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এই হত্যাকাণ্ড কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে।
অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ৪৫১ জনকে। ১৭৩ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই অভিযান অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তবে শুধু অভিযান চালালেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিযানের পর কী হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের দাবি, অনেকেই দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ বক্তব্যের সঙ্গে মামলার দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আবার আটক ৬২৪ জনের সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এমন তথ্যও পুলিশ দেয়নি।
৪৫১ জনের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাই গণহারে আটক করাই সমাধান নয়। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। যারা অপরাধে জড়িত নয়, তাদের হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।তবে শুধু পুলিশ দিয়ে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে এবং সন্ধ্যার পর কোথায় থাকে, তা অভিভাবকদের জানতে হবে। নজর রাখতে হবে স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকেও। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের একত্র করার তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে। এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপরাধী চক্র নিজেদের পরিচয় ও শক্তি প্রদর্শন করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এই মাধ্যমেও নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। কিশোর গ্যাং দমনে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একদিনের বড় অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান। শনাক্ত করতে হবে গ্যাংয়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণও খুঁজে বের করতে হবে।
কিশোরদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তাদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে তাদের যুক্ত করতে হবে। কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এখন প্রয়োজন এর ধারাবাহিকতা। প্রয়োজন সঠিক তদন্ত। প্রয়োজন শক্তিশালী মামলা। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে নিরপরাধ কিশোরদের সুরক্ষা। কিশোর গ্যাংয়ের শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।