দুপুর কিংবা রাতে পেট ভরে ভাত খাওয়ার পর শরীরজুড়ে এক ধরনের অলসতা ভর করে, চোখ দুটি ভারী হয়ে আসে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সবারই। অনেকেই এই ঘুম ঘুম ভাবের জন্য অতিরিক্ত খাওয়াকে দায়ী করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর আসল কারণটি আমাদের ভাবনার চেয়েও গভীর এবং এটি শরীরের এক জটিল জৈব-রসায়নের সাথে জড়িত।
কেন আসে এই তন্দ্রাভাব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাত খাওয়ার পর যে তন্দ্রাভাব তৈরি হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে ভাতে থাকা শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। ভাত খাওয়ার পর শরীরে হরমোনের একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়:
১. ইনসুলিনের ভূমিকা: ভাত একটি শর্করা-সমৃদ্ধ খাবার। এটি খাওয়ার পর শরীরে ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। ইনসুলিন রক্তপ্রবাহ থেকে অন্যান্য অ্যামাইনো অ্যাসিড দূর করলেও 'ট্রিপটোফ্যান' (Tryptophan) নামের একটি বিশেষ অ্যামাইনো অ্যাসিডকে রেখে দেয়।
২. মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন: রক্তে অন্যান্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রতিযোগিতা না থাকায় ট্রিপটোফ্যান খুব সহজেই মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে।
৩. মেলাটোনিন তৈরি: মস্তিষ্কে পৌঁছে এই ট্রিপটোফ্যান প্রথমে 'সেরোটোনিন' এবং পরবর্তীতে 'মেলাটোনিন' হরমোনে রূপান্তরিত হয়। এই মেলাটোনিনই মূলত আমাদের শরীরের ঘুম ও বিশ্রামের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি হালকা তন্দ্রাভাব তৈরি হয়।
ভাতের পরিমাণ ও ধরন কি প্রভাব ফেলে?
খাবারের পরিমাণ এবং চালের ধরনও এই ঘুমের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ** রক্তপ্রবাহের দিক পরিবর্তন: বেশি পরিমাণে ভাত খেলে তা হজম করার জন্য শরীরের সিংহভাগ রক্তপ্রবাহ পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রের দিকে চলে যায়। ফলে মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায়, যা আমাদের সতর্ক থাকার শক্তি কমিয়ে দেয়।
** সাদা বনাম লাল চাল: সাদা ভাত বেশি পরিশোধিত বা রিফাইন্ড হওয়ায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং ঠিক ততটাই দ্রুত নামিয়ে দেয় (Crash)। রক্তে শর্করার এই ওঠানামার কারণে খাওয়ার পর ক্লান্তি ও ঘুম বেশি অনুভূত হয়। অন্যদিকে লাল চালের ভাতে এই সমস্যা তুলনামূলক কম হয়।
** বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: শুধু ভাত নয়, যেকোনো উচ্চ-গ্লাইসেমিক কার্বোহাইড্রেট একা খেলে এমনটা হতে পারে। তাই দুপুরের খাবারকে ক্লান্তিহীন করতে ভাত সবসময় ডাল, শাকসবজি বা চর্বিহীন প্রোটিনের (মাছ/মাংস) সাথে মিশিয়ে খাওয়া উচিত। এতে ফাইবার ও প্রোটিনের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং বিকেল জুড়ে শক্তি বজায় থাকে। সেই সাথে খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ার অভ্যাস করা ভালো।
রাতে ভালো ঘুমের প্রাকৃতিক ওষুধ ‘ভাত’
ভাত খাওয়ার পর তাৎক্ষণিক যে তন্দ্রাভাব দিনের বেলায় আমাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়, তা কিন্তু রাতে গভীর ঘুমের জন্য দারুণ উপকারী হতে পারে।'নিউট্রিয়েন্টস' জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ভাত জাতীয় খাদ্য গ্রহণ মানুষের ঘুমের মান উন্নত করতে সরাসরি সাহায্য করে।
৬০ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত খাদ্যতালিকায় প্রধান শর্করা হিসেবে ভাত রেখেছিলেন, তাদের শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে গেলে শরীর খুব দ্রুত নিজেকে মেরামত বা
হিল করতে পারে। গবেষকদের মতে, খাদ্যতালিকায় প্রধান শর্করা হিসেবে নিয়মিত ভাত বেছে নেওয়া রাতে গভীর ও প্রশান্তিময় ঘুমের একটি অত্যন্ত সহজ ও প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে পারে।
