দেশে চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলের কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিটের সবকটিই এখন পুরোদমে চালু রয়েছে। কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখান থেকে ২২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তাতে সঙ্কটের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলছে।
পানি দিয়ে পানির দরেই বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। দেশের অন্যান্য জ¦ালানি-ভিত্তিক (গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যখন জ্বালানি সঙ্কটে ধুকছে তখন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত এই পানি বিদ্যুৎ সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস হিসাবে ভূমিকা রাখছে। সেখানে প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ মাত্র ৫০ পয়সা। পক্ষান্তরে অন্যান্য জ্বালানি নির্ভর কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুণতে হচ্ছে ইউনিট প্রতি তিন থেকে চার টাকা। আবার জ্বালানি সঙ্কটে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে ওই সব বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানিস্বল্পতায় ভুগতে হয় কাপ্তাইয়ের পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে। জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে অনাবৃষ্টি, তাতে কাপ্তাই লেকে পানির উচ্চতা বছরে প্রায় ছয় মাস স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দিনের বেলায় বন্ধ রেখে সন্ধ্যায় পিক আওয়ার কয়েকটি ইউনিট চালু রাখতে হয়। ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ওই কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট থেকে সামান্য বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যায়। তবে এখন পানির সঙ্কট নেই। বরং হ্রদের পানির স্তর অনেক বেড়ে গেছে।
এই অবস্থায় চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৫৮ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান।তিনি দৈনিক আমার প্রেরণাকে বলেন, কাপ্তাই হ্রদের অতিরিক্ত পানির চাপ কমাতে বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট ৩ ফুট করে খুলে দিয়ে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হ্রদ থেকে পানি ছাড়ার কারণে ভাটির অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে পানি ছাড়ার আগে লোকজনকে সতর্ক করা হয়। শনিবার রাত ৮টার দিকে পানি ছাড়া শুরু হয়। এ সময় প্রতিটি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশিত হয়েছে।পরে ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার পর আবার পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৮ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হয়েছিল। এরপরও পরিস্থিতি অনুকূলে না আসায় গতকাল সকাল ১০টায় প্রতিটি গেট ৩ ফুট করে খুলে দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫৮ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে।
পানি ছাড়া অব্যাহত থাকবে বলেও দৈনিক আমার প্রেরণাকে জানান তিনি। বর্তমানে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে। সবকটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে আরো প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে।জানা গেছে, লেকের পানি ছেড়ে দেয়ায় রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল ও জুরাছড়িসহ জেলার হ্রদবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল থেকে পানি সরে যেতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত পানির কারণে ওইসব এলাকা প্লাবিত হয়।
ডুবে যায় রাঙামাটি পর্যটন মোটেলের আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতুটিও। হ্রদে পানি বেড়ে যাওয়ায় বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্থাপনা ও ফসলি জমি তলিয়ে যায় বলেও খবর পাওয়া গেছে। বাঘাইছড়িতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে।বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত হ্রদে পানির স্তর ছিল ১০৬ দশমিক ০২ এমএসএল (মিন সি লেভেল)। কাপ্তাই হ্রদের সর্বোচ্চ পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল। এর ১০৫ ফুট পার করলে বিপৎসীমা ধরা হয়।কারণ পানির স্তর ১০৫ থেকে ১০৮ এমএসএল পর্যন্ত উঠলে রাঙামাটির অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আর এই কারণে দ্রুত পানি ছেড়ে দিতে হয়।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। এ কারণে কাপ্তাই, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা দৈনিক আমার প্রেরণাকে জানান, কাপ্তাই হ্রদে ধারণ ক্ষমতা ১০৯ এমএসএল হলেও এখন ১০৫ এমএলএস উঠতে অনেক এলাকা বিশেষ করে হ্রদের ভেতরে অবৈধভাবে নির্মিত বসত ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা তলিয়ে যায়। আবার লেক ভরাট, পাহাড় টিলা নিধনসহ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে হ্রদের উচ্ছতা বাড়ছে। তাতে পানি একটু বাড়তেই লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে।
হ্রদের পানি বাড়লে একদিকে যেমন পুরোদমে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তেমনি কর্ণফুলীর উজানে লবণাক্ততার সমস্যাও থাকে না। গত কয়েক বছর ধরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অনাবৃষ্টি আর খরা পরিস্থিতির কারণে পানির উচ্চতা বছরের অর্ধেক সময় স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার হ্রদ থেকে কর্ণফুলীতে পানির প্রবাহ কমে গেলে জোয়ারের পানি উজানে উঠে আসছে। তাতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির মূল উৎস হালদায় লোনা পানি ডুকে পড়ছে।
এরফলে ওয়াসার পানিতে লবণক্তার মাত্রা বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হচ্ছে। লোনা পানির আগ্রাসনে এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদার পরিবেশেও বিরুপ প্রভাব পড়ছে। লোনা পানির কারণে কর্ণফুলী নদী তীরবর্তি আনোয়ারা, বোয়ালখালী উপজেলার ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।১৯৫৬ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়।
এজন্য তৈরি হয় কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষ হয় ১৯৬২ সালে। ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ ও ৫৪.৭ মিটার উচ্চতায় এ বাঁধটি নির্মাণ করে। এ বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ পানি নির্গমন পথ বা স্প্রিলওয়ে রয়েছে। এ স্প্রিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফুট পানি নির্গমন করতে পারে।
এ প্রকল্পের জন্য প্রথম বাজেট ধরা হয় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে তা পরে ৪৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা কর্ণফুলী নদীর পানির বেগ ব্যবহার করে টার্বাইন যন্ত্রের মাধ্যমে উৎপাদিত হয় বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা দৈনিক আমার প্রেরণাকে বলছেন, কর্ণফুলী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো বছর সচল রাখতে হলে হ্রদের গভীরতা বাড়াতে হবে। সেইসাথে হ্রদ দখল করে অবৈধ স্থাপনা, পাহাড় নিধনসহ পরিবশে বিপর্যয় রোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।