অবসর সময় কী করেন? কাউকে এই প্রশ্ন করা হলে বেশিরভাগের উত্তর হবে একই। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি বা রিলস/ভিডিও দেখি। কেউ বলবেন মোবাইলে খবর দেখি। কারো উত্তর হয়ত হবে মোবাইলে মুভি দেখি বা গেমস খেলি। অর্থাৎ যা ই করা হোক না কেন, সব মোবাইল কেন্দ্রিক।
বই পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সবাই মিলে গল্প কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে আট থেকে আশি সবার হাতেই আছে স্মার্টফোন। আর সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সঙ্গী। বিনোদন, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের মাধ্যম, কেনাকাটা— সব এখন হাতের মুঠোয়।
তবে এই মোবাইলেই মানুষ এখন এত বুঁদ হয়ে গেছেন যে পাশের মানুষটিরও খোঁজ নেওয়ার সময় মিলছে না। অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি ধীরে ধীরে মানুষের সময় ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সময় হারাচ্ছে কই?
স্মার্টফোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘অদৃশ্য সময় ক্ষয়’। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেও রিলস দেখতে দেখতে কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কেটে যায়, তা টের পান না অনেকেই।ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব শর্টস বা ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে।
যাতে ব্যবহারকারীরা একের পর এক কনটেন্ট দেখতে থাকেন। ফলে কাজের ফাঁকে বা বিশ্রামের সময় একটু ফোন দেখার অভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপচয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এই অভ্যাসটি কমিয়ে দিচ্ছে উৎপাদনশীলতা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কমাচ্ছে পড়াশোনায় মনোযোগ।

সবাই ব্যস্ত, কিন্তু একা!
একই ঘরে বসে থেকেও অনেক পরিবারে সদস্যরা এখন আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকেন। পরিবারের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সময়, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময়ও যার যার চোখ থাকে ফোনের পর্দায়। একের সঙ্গে অন্যের যোগাযোগের চেয়ে নিজে ব্যস্ত থাকা যেন এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমে গেলে সম্পর্কের গভীরতাও কমে যায়। ইমোজি ও ছোট বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ যত সহজ হয়েছে, ততই কমছে মুখোমুখি কথোপকথনের চর্চা। ফলে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত থাকলেও আবেগগতভাবে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

মনোযোগের সংকট বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে মনোযোগের ওপর। নিয়মিত নোটিফিকেশন, মেসেজ, ভিডিও ও নতুন কনটেন্টের প্রবাহ মানুষের মনকে এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত সরিয়ে নিতে অভ্যস্ত করে তুলছে।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়া, গবেষণা করা বা গভীর মনোযোগ প্রয়োজন এমন কাজগুলোতে অনেকে আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না। সবাই যেন শর্টকাটে সব কাজ সারতে চাইছেন। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

অবসরও কাটে অনলাইনে
একটা সময় অবসর মানে ছিল হাঁটতে যাওয়া, গল্প করা, খেলাধুলা বা কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়া। এখন অনেকের অবসর কাটে ফোন স্ক্রল করতে করতে। ফলে কমছে শারীরিক সক্রিয়তা, বাড়ছে ঘুমের সমস্যা। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করছে ভার্চুয়াল জগৎ। সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে তাই বর্তমানে এই অভ্যাসে লাগাম টানার বিকল্প নেই। কিন্তু কীভাবে?
প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্টফোন নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। সময় ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার না করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন দূরে রাখা এবং নিয়মিত অফলাইন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে মোবাইলের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আনা সম্ভব।

অনলাইন-অফলাইন জীবনের ভারসাম্য
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যোগাযোগকে সহজ করেছে, তথ্যপ্রাপ্তিকে দ্রুত করেছে এবং অনেক কাজকে হাতের নাগালে এনে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যদি মানুষের সময়, মনোযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই সুবিধার মূল্যও কমে যায়।
তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। বরং প্রযুক্তিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাতে থাকা স্মার্টফোন যেন সময়ের নিয়ন্ত্রক না হয়ে মানুষের প্রয়োজনের একটি উপকরণ হয়ে থাকে— সেদিকে নজর দিলেই জীবন হবে সহজ সুন্দর।