
মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী: বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে| একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত অর্থনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘সৃজনশীলতা’ | মানুষের সৃজনশীল কাজকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তা-ই সৃজনশীল অর্থনীতি নামে পরিচিত| কৃষি ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’, যেখানে মানব মেধা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল দক্ষতাই মূল সম্পদ|
মূলত, সৃজনশীলতা মানুষকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে| বিশ্বব্যাপী এই খাত দ্রুত বর্ধনশীল| ব্রিটিশ লেখক এবং উদ্ভাবক জন হাউকিন্স ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র ধারণার প্রবর্তক হিসেবে বিশ্বখ্যাত| তিনি ২০০১ সালে প্রকাশিত তার ‘দি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: হাউ পিপল মেক মানি ফ্রম আইডিয়াস’ বইতে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র ধারণার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা ও শিল্পের উন্নয়নকে তুলে ধরেন| তিনি মূলত সৃজনশীলতা, বুদ্ধি, এবং তথ্যের অর্থনৈতিক ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন|
এ ধারনাটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বর্ণনা করে যেখানে মূল্য ঐতিহ্যবাহী সম্পদের উপর ভিত্তি করে নয় বরং অভিনব কল্পনাপ্রসূত গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়| সৃজনশীল শিল্পের তুলনায়, ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ শব্দটি সমগ্র অর্থনীতি জুড়ে সৃজনশীলতা বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়| প্রকৃতপক্ষে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবন নিশ্চিত করে|
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন যে সৃজনশীলতা হল একবিংশ শতাব্দীর উন্নত অর্থনীতির একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, ঠিক যেমনটি ১৯ শতক এবং ২০ শতকের গোড়ার দিকে উৎপাদন শিল্পের বৈশিষ্ট্য ছিল|কালের পরিক্রমায় সারা বিশ্বে সৃজনশীল অর্থনীতির বাজার বাড়ছে| বলা হয়ে থাকে যে ২০ শতকের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল জ্বালানি তেল| আর ২১ শতকের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো সৃজনশীলতা| ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানী এ.পি.জে. আব্দুল কালাম, উল্লেখ করেছেন “যখন শেখা উদ্দেশ্যমূলক হয়, তখন সৃজনশীলতা বিকশিত হয়|
যখন সৃজনশীলতা বিকশিত হয়, তখন চিন্তাভাবনা বিকশিত হয়| যখন চিন্তাভাবনা বিকশিত হয়, তখন জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে আলোকিত হয়| যখন জ্ঞান আলোকিত হয়, তখন অর্থনীতি বিকশিত হয়|”সৃজনশীল অর্থনীতি, মানব প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভব ঘটানো উদ্ভাবনীমূলক ধারণাগুলিকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে| এটি শিল্পকলার কার্যক্রম ছাড়িয়ে জ্ঞান-ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টিকে (সংগীত, চলচ্চিত্র, নাটক, প্রকাশনা, গ্রাফিক ও ফ্যাশন ডিজাইন, স্থাপত্য, সফটওয়্যার, গেমিং, বিজ্ঞাপন, মিডিয়া, হস্তশিল্প ও ডিজিটাল কনটেন্ট, প্রযুক্তি, নকশা এবং নকশা ভিত্তিক শিল্প) বোঝায়, যা বৈচিত্র্যময় ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি|
এ ধারনার বাস্তব প্রয়োগ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়| একইসাথে এটি শিল্প ও সংস্কৃতির সাথে প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন পণ্য ও পরিষেবা তৈরির সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে|বিশ্বের বহু দেশ সৃজনশীল অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে| বাংলাদেশেও সৃজনশীল অর্থনীতি উন্নয়নের কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনয়নে কাজ করছে| এই খাতে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বেশি এবং তুলনামূলক কম মূলধনে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়|
বর্তমান সরকারি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে| ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে সৃজনশীল শিল্পের বিশাল সম্ভাবনাময় খাতটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, জাতীয় ব্র্যান্ড এবং ভবিষ্যৎ কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে অবদান রাখবে| সৃজনশীল অর্থনীতি খাতসমূহ যথা ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি, অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স, গেমিং, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য কন্টেন্ট তৈরি, ইউটিউব, টিকটক,
পোশাক এবং নকশা, মেকআপ, চলচ্চিত্র ও মঞ্চ শিল্পকলা, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া সেবাদাতা সফটওয়্যার কোম্পানি এবং ইনফ্লুয়েন্সার অর্থনীতি ইত্যাদির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে| এই খাতের অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত করতে এবং উচ্চ দক্ষতা-নির্ভর ভবিষ্যতমুখী খাতে পাঁচ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে নানামুখী কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে| দেশ জুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তোলা হবে| নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এবং রপ্তানি-প্রস্তুত বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য পারফরম্যান্স-ভিত্তিক গ্রান্ট স্কীম চালু করা হবে|
ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে সৃজনশীল অর্থনীতির খাতগুলোর উন্নয়নে ১০ বছরের
বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে| আধুনিক ষ্টুডিও, ইনোভেশন হাব নির্মাণ,
বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং বৈশ্বিক বিপণন কার্যক্রম জোরদার করতে এই
পরিকল্পনা ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করা হবে| বাংলাদেশী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও
এই খাত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সক্রিয় সহায়তা
দেওয়া হবে| আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে সৃজনশীল সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে
‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু করা হবে| সৃজনশীল
অর্থনীতি খাতে কৌশলগত নেতৃত্ব দিতে ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভলপমেন্ট অথরীতি’
গঠন করা হবে|
সৃজনশীলতা ও সৃজনশীল অর্থনীতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা বর্তমানে বিশ্বের
যেকোনো দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ| উন্নত দেশগুলো উচ্চ
সম্ভাবনাময়, প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপ এবং উদীয়মান কোম্পানিগুলোকে এক
ধরনের প্রাইভেট ইক্যুইটি অর্থায়ন(ভেঞ্চার ক্যাপিটাল) প্রদান করে, যাদের
প্রায়শই প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনী খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে|
মূলধনের বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা মালিকানার একটি অংশ লাভ করেন এবং পরামর্শ
প্রদান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা সরবরাহ এবং কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন
করেন|
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ে পর্যাপ্ত জানাশোনা ও প্রয়োজনীয় কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি|আশার কথা এই যে বর্তমান সরকার তরুণদের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে শুরু থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ১৫-৩৫ বছর বয়সী যুবসমাজই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি| প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা দক্ষতায় এই জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়ন করা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য|লেখকঃ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত|