প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 15, 2026 ইং
বয়স্কদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে

আলহাজ্ব মুহাম্মদ ময়নাল হোসেনঃ মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূর জাহান বেগমের অবহেলাজনিত মর্মান্তিক
মৃত্যুর খবরটি কেবল একটি মর্মান্তিক সংবাদ নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সমাজ
ব্যবস্থার এক নির্মম চিত্র। যে মায়ের এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, এক ছেলে
বুয়েটের শিক্ষক এবং একমাত্র মেয়ে স্কুলশিক্ষক—সেই মায়ের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে
একটি চরম নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও পরিত্যক্তপ্রায় ঘর থেকে। মৃত্যুর পর তাঁর
চোখে ফাঙ্গাস জমে যাওয়ার যে বীভৎস দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে
পড়েছে, তা দেখে বিবেকবান যেকোনো মানুষের শিউরে ওঠার কথা।
এই ঘটনা প্রমাণ
করে, বাহ্যিক শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই মানুষ প্রকৃত ‘মানুষ’
হয়ে ওঠে না। এটি আমাদের চরম সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক মূল্যবোধের
দেউলিয়াত্বকে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।আমরা প্রতিনিয়ত জিপিএ-৫, উচ্চশিক্ষা আর বড় বড় ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটছি।
কিন্তু যে শিক্ষা সন্তানকে মা-বাবার প্রতি ন্যূনতম মানবিক ও নৈতিক
দায়িত্ববোধ শেখায় না, সেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কতটুকু?
দেশের সর্বোচ্চ
বিদ্যাপীঠের শিক্ষক কিংবা রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও যদি
নিজের জন্মদাত্রী মায়ের এই করুণ দশা হয়, তবে বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষা
ব্যবস্থা ভেতরে ভেতরে পচে গেছে। সন্তানরা যখন নিজেদের ক্যারিয়ার, আভিজাত্য
আর যান্ত্রিক জীবনের মোহে অন্ধ হয়ে জন্মদাত্রী মাকে অবহেলা করে, তখন তা আর
কেবল পারিবারিক কলহ থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় একটি সামাজিক ব্যাধি।আমাদের সমাজে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কেবল নৈতিকতার ফ্রেমে বাঁধা
নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও বটে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার
ভরণ-পোষণ আইন’ পাস করা হয়েছে, যেখানে মা-বাবার দেখাশোনা না করাকে
শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু আইন করে কি আসলেই
ভালোবাসা কিংবা মানবিক বোধ তৈরি করা যায়? শুধু টাকা পাঠানোই দায়িত্ব নয়,
মা-বাবা ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করাও সন্তানের প্রাথমিক কর্তব্য।
বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায়। এই সময় তাদের প্রয়োজন নিয়মিত
চিকিৎসা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটু ‘সময়’।
মা-বাবাকে
ঘরের কোণে অবহেলায় ফেলে রাখা স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘন।নূর জাহান বেগমের সন্তানরা আইন ও নৈতিকতা—উভয় দিক থেকেই নিজেদের দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।মিরপুরের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ও সমাজে বয়স্ক
নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া
প্রয়োজন।পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনের অধীনে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে
হবে।
প্রতিবেশীদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা এভাবে ঘরের
কোণে নীরবে মারা না যান। স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত
প্রবীণদের সুরক্ষায় তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা।নূর জাহান বেগমের এই করুণ পরিণতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে,
আমরা এক ভয়াবহ আত্মকেন্দ্রিক সমাজে বসবাস করছি। আজ যদি আমরা প্রবীণদের জন্য
একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে না পারি,
তবে আগামীতে আমাদেরও
একই নিয়তি বরণ করতে হতে পারে। এই সামাজিক পচন রোধ করতে হলে শিক্ষার সাথে
নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে হবে এবং পারিবারিক বন্ধনগুলোকে পুনরায় দৃঢ় করতে হবে।
মা-বাবার স্থান যেন কোনোভাবেই নোংরা ঘরে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব
আমাদের সবার।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক আমার প্রেরণা ডট কম